শনিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১১

শহীদ মো: মুস্তাফিজুর রহমান

শহীদ নং-১৩ : মো: মুস্তাফিজুর রহমান
নাম: মো: মুস্তাফিজুর রহমান
সাংগঠনিক মান: সাথী প্রার্থী
শহীদ হওয়ার তারিখ: ১২ ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৯৫
পিতার নাম: মো: গোলজার রহমান
সর্বশেষ পড়াশুনা: ২য় বর্ষ সম্মান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
জীবনের লক্ষ্য: অধ্যাপনা।
শহীদ হওয়ার স্থান: শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল।
আঘাতের ধরন: স্টেনগানের গুলি।
কাদের আঘাতে শহীদ: জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: আলম ডাঙ্গা স্টেশনপাড়া, ডাক: আলম ডাঙ্গা, থানা: আলম ডাঙ্গা, জেলা: চুয়াডাঙ্গা।
ভাইবোন : ১২ জন।
ভাই-বোনদের মাঝে অবস্থান: ৫ম।
পরিবারের মোট সদস্য: ১৫ জন।
পিতা: জীবিত, পেশা: ব্যবসায়ী।
মাতা: মৃত।
শহীদ হওয়ার পূর্বে স্মরণীয় বাণী: শহীদ মুস-াফিজ বলতেন, “আমরা কি বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত অবস'ায় দেখে যেতে পারব? না শুধুমাত্র প্রচেষ্টা চালাতেই সময় চলে যাবে?
শাহাদতের পর শহীদের পিতা-মাতার প্রতিক্রিয়া: কান্না বিজড়িত কণ্ঠে শহীদের পিতা বলেন, আমার মুস্তাফিজ শহীদ হয়েছে তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্রের মাঝে আমার মুস্তাফিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। আমার একটি মাত্র কামনা আমার মৃত্যুর পর যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের কর্মীরা আমার জানাযার নামাযে হাজির হয় ও নিজ হাতে দাফন করে।
শাহাদাতের প্রেক্ষাপট: শহীদ মুস্তাফিজ ও ইসমাইল হোসেন
বছর ঘুরে ফেব্রুয়ারী আবার ফিরে এলো। গতানুগতিকভাবে সন্ত্রাসীদের ঐ তথাকথিত শ্ল্লোগান “আবার এলো ফেব্রুয়ারী চলো যাই শিবির মারি।” এই শ্লোগান তাদের হত্যার নেশাকে আবারো উদ্বেলিত করে। ৬ ফেব্রুয়ারীকে টার্গেট করে সন্ত্রাসীরা ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে। আশংকা হচ্ছিল ৬ ফেব্রুয়ারী সন্ত্রাসীরা শিবিরের ওপর হামলা করতে পারে। তথ্য পাওয়া গেল সন্ত্রাসীরা অস্ত্র যোগাড় করতে পারেনি বলে ৬ ফেব্রুয়ারী হামলা করা সম্ভব হয়নি। চলতে থাকে তাদের অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপক তোড়জোড়। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে অন-ত ২০/২৫ জন শিবির মেরে ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রদের মাঝে শিবির না করার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া। লক্ষ্যমাত্রা বাস-বায়নের ক্ষেত্র হিসাবে সন্ত্রাসীরা টার্গেট করলো ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্ব হোসনে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম খচিত সবুজ পটে অঙ্কিত লাল রঙের সুবিশাল চারতলা হলটিকে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে বেছে নেয় সোহরাওয়ার্দী হলের ২১৪,২২০, ২২৯ নং কক্ষ। এই তিনটি কক্ষে হল কর্তৃপক্ষ ৩টি আসন বরাদ্দ করে রেজাউল করিম, আলফাজ উদ্দীন আর মতিউর রহমান নামক তিন ছাত্রের নামে। আর এই তিনটি কক্ষে অবস'ান করতো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সশস্ত্র ক্যাডার অপু, কটু, আর আজগর। ক্যাডারদের আবাসিক বিলাসিতা আর সকল অপকর্ম নির্বিঘ্নে সম্পাদন করার জন্য ২ আসন বিশিষ্ট কক্ষকে তারা এক আসন কক্ষে পরিণত করে। রাত যত গভীর হতো ২১৪ নং কক্ষ পরিণত হতো ফেনসিডিল, আফিম, গাজা ইত্যাদির আসরে।
বরাদ্দপ্রাপ্ত ছাত্রগণ তাদের নামে বরাদ্দকৃত বৈধ সীটে উঠতে গেলে সন্ত্রাসীরা নানা হুমকির মাধ্যমে তাদের বের করে দেয়। তারা হল কর্তৃপক্ষের হস-ক্ষেপ কামনা করলে হল প্রভোষ্ট প্রফেসর আব্দুল আজিজ তাদের স্বআসনে উঠিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন' ইতিমধ্যে সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে হল প্রভোস্টকে নানাভাবে লাঞ্ছিত, অপমাণিত করে এবং সন্ত্রাসীদের রুমের সামনে গেলে হত্যার হুমকি দেয়। হল প্রভোস্ট সন্ত্রাসীদের কাছে নতজানু হয়ে প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, ও সি’র মধ্যস'তায় উক্ত তিনজন ছাত্রকে অন্যরুমে বরাদ্দ দিয়ে ২১৪, ২২০ ও ২২৯ নং কক্ষকে সিলগালা করে দেন।
সন্ত্রাসী মাস-ানদের অপকর্মের আখড়া যখন সিলগালা করে দেওয়া হল তখন তারা দিশেহারা হয়ে শিবির কর্মীদের বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করতে থাকে। শিবির কর্মীদের পাহাড়সম ধৈর্য্যের কাছে তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা হাবুডুবু খেয়ে সমুদ্রের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেলে তারা বেছে নেয় সন্ত্রাসের পথ। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে হল কর্তৃপক্ষ দু’জন হিন্দু ছাত্রসহ অন্য একজন মুসলমান ছাত্রকে ঐ তিনটি কক্ষে আসন বরাদ্দ দেন এবং ১১ ফেব্রুয়ারী সকাল ১০ টায় হল প্রভোস্ট তাদের নির্দিষ্ট আসনে তুলে দেন। বিকেল ৫ টার সময় ছাত্র দলের সন্ত্রাসীরা ঐ তিনজন ছাত্রকে তাদের রুম থেকে বের করে দেয় এবং অপমানিত করে। তাদের বিছানাপত্র নিচে ফেলে দেয়। সাধারণ ছাত্র তিনজন তৎক্ষণাত শিবিরের হল নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হন। শিবির নেতৃবৃন্দ সাধারণ ছাত্রের ন্যায় সঙ্গত অধিকার বাস-বায়নের অঙ্গীকার নিয়ে হল প্রভোস্টের সাথে সাক্ষাৎ করে অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে নিবৃত করার আহবান জানান। প্রভোস্টের সাথে সাক্ষাৎ করে শিবির নেতৃবৃন্দ হল গেটে পৌঁছলে বাদ মাগরিব দেখতে পান হল গেটে ৫০/৬০ জন ছাত্রদল ক্যাডার সশস্ত্র অবস'ায় অবস'ান করছে। এদিকে হল প্রভোস্ট গেটের অবস'া জেনে সন্ত্রাসীদের ভয়ে হলের দিকে আর পা বাড়ানোর সাহস করেননি।
সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে অন্যান্য হলের সাধারণ ছাত্রসহ শিবির কর্মীরা। শহীদ হাবিবুর রহমান হল আয়োজন করে এক প্রতিবাদ মিছিলের। সুসজ্জিত ছাত্রদল ক্যাডার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে হামলা করে মিছিলে। প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে আশ্রয় নেয় তাদের একমাত্র আশ্রয়স'ল মাদার বখ্‌শ হলে। শিবির কর্মীরা ধারণা করছেন হয়তো এবার সন্ত্রাসীরা নিবৃত হবে। এদিকে শিবির কর্মীরা তাদের পবিত্র ইবাদত রোজা পালনের উদ্দেশ্যে সেহ্‌রীর প্রস'তি স্বরূপ ঘুমে নিমগ্ন হন। গাছপালা, পশুপাখি, সবুজ ভূমি সকল প্রাণীকূল যখন অঘোর ঘুমে নিমগ্ন তখন সন্ত্রাসীরা নিশাচরের ন্যায় অস্ত্র, মাস্তান ও সন্ত্রাসী আমদানী করে মাদার বখ্‌শ হলে জড়ো করে এবং রাজশাহীর তৎকালীন মেয়রের নেতৃত্বে শিবির হত্যার একটি সুনিপুণ নকশা তৈরি করে। সাধারণ রোজাদারসহ শিবির কর্মীরা যখন রোজা পালনের উদ্দেশ্যে সেহেরী খাওয়ায় ব্যস- তখন নির্দিষ্ট সময়ে সেহ্‌রী সম্পন্ন করেন অন্যান্যদের ন্যায় শহীদ মুস্তাফিজুর রহমান ও শহীদ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। প্রতিদিন সবার মত সেহ্‌রী শেষে ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করে ক্লান- অবসাদ দেহকে এলিয়ে দেন বিছানায়। হয়তো জানেন না শহীদ মুস্তাফিজুর রহমান, শহীদ ইসমাইল হোসেন সিরাজী কিংবা জানেন না তাদের কাছের সুপ্রিয় ভাইরা কিংবা কোন সৃষ্টিকুল যে তারা কিছুক্ষণ পরেই সাক্ষাৎ করছেন মহাপ্রভু আল্ল্লাহর সাথে। জানেন শুধুমাত্র সবার প্রভু আল্ল্লাহ, যিনি পছন্দ করেছেন বাগানের দুটো শ্রেষ্ঠ ফুটন- ফুলকে।
মেয়রের অঙ্কিত নীল নকশা অনুপাতে স্টেনগান, কাটা রাইফেল, ককটেল, বন্দুক, পাইপগান, রিভলভার ইত্যাদি অত্যাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত হযে বাদ ফজর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ঢুকে ঘুমন- শিবির কর্মীদের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে খুনীচক্র। মেতে ওঠে তারা রক্তের হোলি খেলায়। দু’গ্রুপে বিভক্ত হযে তারা ১ম ব্ল্লক এবং মধ্য ব্ল্লকের দোতলায় উঠে বৃষ্টির মত গুলি চালাতে থাকে। মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজে দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে ঘুমন- শিবির কর্মীসহ সাধারণ রোজাদারগণ। আহত হন শত শত ছাত্র। অনেকে প্রাণ ভয়ে লাফিয়ে পড়েন ছাদ থেকে। সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসের মোকাবেলার জন্য নিজের জানকে বাজি রেখে অত্যন- সাহসিকতার সাথে বেরিয়ে আসেন ২৪৮ নং কক্ষ থেকে মুস্তাফিজুর রহমান। সামনে এগুতেই দেখতে পান অস্ত্র সস্ত্রে সজ্জিত ২০/২৫ জন সন্ত্রাসী বাহিনী গুলি করতে করতে তার দিকে এগিয়ে আসছে। মুস্তাফিজুর রহমান তখন ডাইনিং এর ছাদে অবস'ান নিয়েছিলেন। সেখানে দাঁড়াতেই সন্ত্রাসীরা অত্যন- নিকট থেকে গুলি করে পাখির মত শিকার করে শহীদ মুস্তাফিজকে। গুলি করে সন্ত্রাসীরা নিশ্চিত হতে না পেরে আবার তারা মুস্তাফিজের বুকে পিস-ল ঠেকিয়ে দু’ দু’টি ফায়ার করে। শির উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন শহীদ মুস্তাফিজ। চলে গেলেন আল্লাহর সান্নিধ্যে। শিখিয়ে গেলেন “যারা আল্লাহর পথে নিহত হন তাদেরকে তোমরা মৃত বল না, বরং তারা জীবিত।”
১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী পবিত্র রমজান মাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নজিরবিহীন সন্ত্রাসের নমুনা বহন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম হল শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের শ্বেত দেওয়ালের সেই মুহর্মুহুগুলির কালো দাগগুলো। নিমর্ম স্মৃতি বহন করছে শহীদ মুস্তাফিজের জমাট বাধা রক্তের স'প ডাইনিং এর ছাদে আর বারান্দায় ফোঁটা ফোঁটা রক্তের ছাপ।


জান্নাতী সৌরভে সিক্ত মুস্তাফিজ

ডাঃ মোঃ গোলজার রহমান

মুস্তাফিজের বয়স যখন নয় মাস তখন ওর মা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এমতাবস'ায় আমি ওকে দু’মাস কাছে রেখে লালন পালন করি। ঐ সময় রাজাকার বাহিনী গ্রামগঞ্জে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। মিনা পাড়া গ্রামেও তারা ঢুকলে গ্রামবাসীর সাথে সংঘর্ষ হয় এবং কিছু রাজাকার মারা যায়। এই সংবাদ পেয়ে পাক বাহিনী এসে আমার বাড়িসহ গ্রামের অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। আমি পাক বাহিনীর কাছে গেরিলা মেজর বলে আখ্যায়িত হওয়ার কারণে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হয়। এমতাবস'ায় মুস্তাফিজকে আমার কাছে রাখা সম্ভব ছিলনা। তাই ওকে ওর নানীর কাছে রেখে আসি। যখন ওর বয়স পাঁচ বছর হয় আমার কাছে (মিনা গ্রামে) নিয়ে আসি এবং স্কুলে ভর্তি করে দেই। আমি জীবননগর থানাধীন হাসাদহ বাজারে ডাক্তারী প্রাকটিস করতে থাকি। তখন মুস্তাফিজ ২য় শ্রেণীতে এবং হাফিজ তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। কিন' সৎমার কাছে থেকে ওদের পড়াশুনার অসুবিধা হচ্ছে বুঝতে পেরে আমি ওদেরকে আমার নিজের কাছে অর্থাৎ হাসাদাহ স্কুলে ভর্তি করে দেই। এখান থেকেই ওরা ফাইভ পাস করে। ঐ সময় আমি আলমডাঙ্গা শহরে বাড়ি ক্রয় করি এবং ওদেরকে আলমডাঙ্গা হাইস্কুলে ভর্তি কর্‌ি আলমডাঙ্গা হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করলে আমি মুস্তাফিজকে কোটচাঁদপুর সরকারী কলেজে ভর্তি করে দেই।
কলেজ জীবনে এসেই মুস্তাফিজ ইসলামী ছাত্রশিবিরের দাওয়াত পেয়ে ইসলামী আন্দোলনে শরিক হয়। মুস্তাফিজের অমায়িক আচরণে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ছাত্রশিবিরে যোগ দেয়। একারণে মুস্তাফিজ ছাত্রদলের বাকা দৃষ্টিতে পড়ে। একদিন হঠাৎ করে বিনা উস্কানীতে ছাত্রদল শিবিরের ওপর আক্রমণ করে বসে। কিন' সাধারণ ছাত্ররা শিবিরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের মোকাবেলা করে।
ফলে ছাত্রদল ক্যাম্পাস ছেড়ে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। পরে ওরা পুলিশ নিয়ে এসে ছাত্র শিবিরের কর্মীদেরকে গ্রেফতার করায়। পুলিশ শিবির কর্মীদের বেদম মারপিট করে।
ফলে মুস্তাফিজসহ অনেক শিবির কর্মী শুরুতর আহত হয়। শুধু তাই নয় ছাত্রশিবিরকে মিথ্যা মামলায়ও জড়িয়ে দেয়। ঐ মামলায় ইসলামী ছাত্রশিবির বেকসুর খালাস পায়। এ ভাবেই মুস্তাফিজ কোটচাঁদপুর কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মুস্তাফিজ যখনই বাড়িতে আসত তখনই সংসারের যাবতীয় কাজ করত। বিশেষ করে গাছপালা লাগানো, ফুলের বাগান করা ছিল তার নেশা। ১৯৯৫ সালে জানুয়ারী মাসে ছুটিতে বাড়ি আসে। তখন গ্রামে ধান লাগানোর সময়। আমি পঙ্গু হওয়ার কারণে ধান লাগাতে পারবনা দেখে সে নিজেই ১৭ তারিখে ধানের চারা কিনে আনে। আমি বললাম, তুমি আমাদের সাথে থেকে ধান লাগানোর কাজ সম্পন্ন করে রাজশাহী যাবে। এ কথা শুনে সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন আমি বললাম, তোমার কি হল? নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন? তখন মুস্তাফিজ খুবই নম্র স্বরে বললো, আব্বা আমাকে ১৯ জানুয়ারী ৯৫ রাজশাহী পৌঁছাতেই হবে। কারণ সংগঠন আমাকে ১৯ তারিখ পর্যন-ই ছুটি দিয়েছে। তখন আমি বললাম, তবে যাও ‘তায়াক্কালতু আলাল্ল্লাহি’। এটাই আমার সাথে মুস্তাফিজের শেষ কথা।
শাহাদাতের এক সপ্তাহ আগে মুস্তাফিজ একটা ব্যাগে কিছু বই পুস-ক মামুনের কাছে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আমি ঘরে ঢুকে ব্যাগ দেখে জিজ্ঞাসা করলাম মুস্তাফিজ কোথায়? বাড়ি থেকে ওর মা বললো, মুস্তাফিজ তো আসেনি। তখন আমার কলিজার মধ্যে বিদ্যুতের মত চমকে উঠল। মনে হল তাহলে আমার ছেলে নেই। আমার বিষন্ন বদন দেখে ওর মা বললো ও রকম করছ কেন? উত্তর দিলাম, ব্যাগ আসল কিন' মুস্তাফিজ আসলনা কারণ কী? ওর মা বললো, ‘যে ইসমাইল আসছিল না, আমাদের বাসায়? মুস্তাফিজ তার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ যাবে এবং দু’জন এক সাথে ঠাকুরগাঁ (পুলিশে চাকুরীরত ভাই ও বোনের বাসা) যাবে। সেখানেই ওরা ঈদ করবে।’ কিন' ১১ই রমজান টেলিফোনে রেল স্টেশনে শাহাদাতের খবর আসে। তখন আমি বুঝতে পারলাম তারা কোন ঈদগাহে গিয়েছে। সে এমন এক ঈদগাহ, যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেনা। যেমন আর কখনই ফিরে আসবে না আমার কলিজার টুকরা শহীদ মুস্তাফিজ। তা না আসুক। এখন আমার একটাই প্রত্যাশা, জান্নাতের সিঁড়িতে যেন দেখা হয় আমার প্রাণপ্রিয় সন-ানের সাথে।
(লেখকঃ শহীদ মুস্তাফিজুর রহমানের গর্বিত পিতা)


মুস্তাফিজ আমার হৃদয়ে, আমার অনুভবে

ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল

গভীর রাত। চারদিকে নীরব নিস-ব্ধ। কয়েক ঘন্টা পূর্বে অর্থাৎ প্রথম রাত্রে সামান্য হৈ চৈ করে ছাত্রদলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হল ছেড়ে বাইরে অবস'ান নিয়েছিল। এখন আসে- আসে- সবাই সরে পড়েছে। আমি মুস্তাফিজকে ডেকে বললাম, এখন পরিসি'তি ভাল মনে হচ্ছে, তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। ও বললো, আমি সেহ্‌রী খেয়ে নামাজ পড়ে একবারে ঘুমাতে যাবো। এই ছিল মুস্তাফিজের সাথে আমার শেষ কথা।
১৯৯৩ সাল। ৬ ফেব্রুয়ারী। স্বরণকালের ভয়াবহ ছাত্র সংঘর্ষের পর সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। ক্যাম্পাস আবারও ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে। এমনি মুহূর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৃহৎ সোহরাওয়ার্দী হল সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। দায়িত্ব পাওয়ার আগে বুঝিনি এ বোঝা কত ভারী। বিশাল হল, ছাত্রদলের কর্মীসংখ্যা তখন দু'শোরও উপরে। আর আমরা শিবিরের কর্মী হাতেগুণা মাত্র ৯ জন। ৬ ফেব্রুয়ারী সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের ব্যাপক পরাজয়ের কারণে তাদের ক্রোধ আর ক্ষোভের মাত্রা আকাশচুম্বী। চলছে তাদের রণ প্রস'তি, চলছে টেনশন। সিদ্ধান- নিলাম হলের জনশক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। হল ও মেস গুলোতে খুঁজতে শুরু করলাম। সংবাদ পেলাম শের-ই-বাংলা হলে, সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্র, একজন কর্মী আছে। নাম মুস্তাফিজ। পরদিনই শের-ই-বাংলা হলে গিয়ে পশ্চিম ৬ নং কক্ষে মুস্তাফিজকে পেলাম। ও আগে থেকেই আমাকে চিনতো। আমাকে দেখেই এমনভাবে হাসলো যা আমার হৃদয়কে চরমভাবে স্পর্শ করলো।
মানুষের হাসি যে এতো মধুর হয় তা আগে কখনও বুঝতে পারিনি। আকস্মিকভাবেই আমার মন খুশিতে ভরে উঠলো। জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছো’? প্রসন্ন হেসে বলল, ‘আল হামদুলিল্লাহ ভাল, আপনি কেমন আছেন’? উত্তর দিয়ে ওর বাড়ির খোঁজ খবর
নিয়ে বললাম, ‘মুস্তাফিজ তোমাকে নিতে এসেছি, সোহরাওয়ার্দীতে যেতে হবে’।
ওর মনটা হঠাৎ মলিন হয়ে গেল। বলল, ‘ইমাজ ভাই অনেক দিন এখানে আছি, এ হলের সাথে এ্যাজাস্ট হয়ে গেছি। তাছাড়া হলের ছাত্রদের সাথে বেশ আন-রিকতার সৃষ্টি হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী হলে না গিয়ে এ হলেই থেকে যাই। আমি তখন সংগঠনের প্রয়োজনের কথা বললাম। দ্বিতীয় আর কোন আপত্তি করেনি। পরদিনই হলে চলে এসেছে। সংগঠনের ওপর কি পরিমাণ আন-রিকতা ও ভালবাসা থাকলে অত্যন- সংকট ও কঠিন সময়ে প্রথম বর্ষের একজন ছাত্র সংগঠনের প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিতে প্রস'ত থাকে, তা এ মুহূর্তে বোঝানো কষ্টকর। ফিরে যেতে হবে ’৯২-৯৩ সালের কঠিন বাস-বতায়। দীর্ঘ ৮ মাস মুস্তাফিজ আর আমি একসাথে, এক বেড়ে ঘুমিয়েছি। তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছি। ওর অনুভূতি ছিল অত্যন- প্রখর। রাতে বিছানার এক কোণে শুয়ে থাকতো। ভালভাবে শোয়ার জন্য বললে বলতো, আপনি বড় ভাই আপনার গায়ে পা লাগলে বেয়াদবি হবে। অনেক সময় রুমে রান্না করতাম। ও আমাকে কখনও রান্নার কাজে হাত দিতে দেয়নি। কারো কাজ করে দেওয়ার মাঝেই ছিল তার আনন্দ। প্রচন্ড মানবীয় চরিত্রের অধিকারী ছিল মুস্তাফিজ। কখনও কারো সাথে খারাপ আচরণ করতে শুনিনি। কাউকে গালমন্দ করেছে সে অভিযোগ কেউ কখনো আনেনি। হলের প্রতিটি কর্মচারী মুস্তাফিজকে অত্যন- ভালবাসতো। ভালবাসতো শুধুমাত্র তার আচার আচরণ, কথাবার্তা আর ব্যবহারের জন্য। কর্মচারীরা আমাকে ডেকে তার প্রসংশা করতো। হলে কাজ করার সময় আমি একটা জিনিস কামনা করেছি যে, হলের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারী, ডাইনিং ক্যান্টিনের বয়বাবুর্চী সবাই যেন শিবিরের সাথে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের পার্থক্যটা বুঝতে পারে। আমরা চেষ্টা করে যতটুকু এগিয়েছিলাম মুস্তাফিজকে, সে অল্প সময়ের ব্যবধানে তার তিনগুণ সাফল্য এনে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস আল্ল্লাহ এভাবেই তার প্রিয় বান্দাদের ত্যাগ আর কাজের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনকে সহযোগিতা করে থাকে। প্রাণ খুলে হাসতে পারতো মুস্তাফিজ। কারো সাথে কথা বলার শুরুতেই এমন মিষ্টি করে হাসতো যা সবারই হৃদয় কেড়ে নিতো। কেউ তার ওপর রাগ করে থাকতে পারতোনা। তার ওপর কোন কারণে কারো রাগ হলে মুস্তাফিজ তার সামনে গিয়ে এমন ভাবে হেসে দিতো যে সে ব্যক্তিটাও হেসে ফেলতো।
মুস্তাফিজদের বাড়িতে একটা চিড়ার মিল ছিল। চিড়ার মিলে কাজ করার সময় হঠাৎ দুর্ঘটনাবসত মুস্তাফিজের আব্বার একটা হাতের কনুই পর্যন- কেটে যায়। এ সংবাদ আমার কাছে যখন আসল তখন মুস্তাফিজের পরীক্ষা চলছে। যার জন্য দুসংবাদটা সময়ে না দিয়ে পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে তাকে বাড়িতে পাঠালাম। বেশ কিছুদিন পরে ফিরে এসে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড কাঁদতে শুরু করল। সান-্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ও বলল, খুব ছোট বেলায় আমার মা মারা গেছে। কিন' আমার আব্বা সে অভাব অনুভব করতে দেয়নি। বাড়িতে কষ্ট হবে ভেবে আমাদের বাইরে রেখে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আব্বার একটা হাত নেই একথা ভাবতে পারছিনা। আমাকে কেন সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ দেননি? অনেক বুঝিয়ে শান- করলাম।
এভাবেই হাসি আনন্দে দিন যাচ্ছিল। তারপর আসল ভয়াবহ ১২ ফেব্রুয়ারী ’৯৫। আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারী, রমজান মাস। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালযের সভাপতি সহ ৯ জন ভাই দীর্ঘদিন পর জেল থেকে মুক্তি পেলেন। কারামুক্তি ছাত্রনেতাদের নিয়ে মিছিল, সমাবেশ ও সম্বর্ধনা শেষে আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে কেন্দ্রীয় মসজিদে সবাই ইফতার ও নামায শেষ করে সবে মাত্র বসেছি। এরই মধ্যে সংবাদ এল সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্রদল দু’টি কক্ষ তালা ভেঙ্গে দখল করে নিয়েছে এবং সকল হলে ছাত্রদলের কর্মীরা ঐ হলে গিয়ে মহড়া দিচ্ছে। এ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে হলে এসে পৌছতেই মুস্তাফিজ এসে সকল খবর দিল, পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রভোষ্ট ও প্রক্টর স্যারেরা মীমাংসা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। আমরা হলের ভিতরেই আছি। এরই মধ্যে হাবিবুর রহমান হলে বিকট শব্দ। সাথে সাথে ছাত্রদলের কর্মীরা হল ছেড়ে দ্রুত বাইরে চলে গেল। আমরা হলের ভিতরে। সারারাত হল পাহারা দেয়া হল। কখন না জানি ছাত্রদল আক্রমণ করে। আমাদের কেউ কেউ এর মধ্যেই ঘুমিয়ে নিয়েছে। যে কয়জন সমস- রাত্রি জেগেছিল তার মধ্যে মুস্তাফিজ একজন। আসে- আসে- রাত ফর্সা হতে শুরু করল। বিশেষ প্রয়োজনে সবে মাত্র বিনোদপুরে পৌঁছেছি। তখন কুয়াশা চারদিক থেকে একটু একটু করে বেড়েই চলেছে।
অফিসে কেবল মাত্র পৌছেছি। এর মধ্যে একজন দ্রুত এসে সংবাদ দিল, মাদার বখ্‌শ হল থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে ছাত্রদল সোহরাওয়ার্দী হলে আক্রমণ করেছে। সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে দৌড়ে জোহা হলের গেটের সামনে পৌছলাম। তখন সোহরাওয়ার্দী হলে গুলির শব্দ হচ্ছে। আমি সবাইকে আমার সাথে আসতে বলে হলের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। কয়েকজন এসে আমাকে বাধা দিয়ে বলল, খালি হাতে এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না।” আমাদের বেশ কয়েকজন এভাবে এগিয়ে মারাত্মক আহত হয়ে ফিরে এল। আমি তাদের কথায় কান না দিয়ে আবার সবাইকে আমার সাথে আসতে বলে দৌড়াতে শুরু করলাম। ৫/৭ জন আমার সাথে আসল। প্রচন্ড ঘনকুয়াশা। চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দু’গজের মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকলে বোঝার উপায় নেই ওখানে কেউ আছে কিনা। দেখতে না পারার কারণে দৌড়ে ওদের খুব কাছে পৌঁছে গেছি। বুঝতে পারেনি। আমাদের দেখে ওরা বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি করল। কয়েকটি আমার কানের পাশ দিয়ে শা করে চলে গেল। শুধু তাকবীর ধ্বনি দিযে এগুচ্ছি আর ওরা পিছাচ্ছে। আমার মাথায় চিন-া শুধু একটাই হলের ভিতর শিবির কর্মীদের কি অবস'া। আমরা যখন মাদার বখ্‌শ হলের সামনে দিয়ে হবিবুরের মাঠ পর্যন- এগিয়েছি তখন ওরা বেপরোয়া গুলি করতে শুরু করে। আমরা সবাই মাঠে শুয়ে পড়ে এগুচ্ছি। তখনও বেশ ঘন কুয়াশা। মাথার ওপর দিয়ে শা শা করে গুলি চলে যাচ্ছে। যে কেউ একটু মাথা উঁচু করলেই তার মাথা গুড়িয়ে যাবে। খুব সাবধানে এগুচ্ছি। আমার ডান পাশে একজন সামনে দেখার জন্য মাথা উঁচু করে আবার গোঙ্গানীর মতো শব্দ করে শুয়ে পড়ল। শব্দ শুনে তার দিকে তাকালাম। সে মাথা উঁচু করে ‘আল্ল্লাহু আকবার’, ‘আল্ল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করছে। দ্রুত কাছে গিয়ে দেখলাম, সে আর কেউ নয় আমাদের প্রিয় ভাই ইসমাইল হোসেন সিরাজী। ব্রাশ ফায়ারের গুলিতে তার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। কয়েকজন তাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল।
আমরা ক্যাম্পাস ঘুরে আবার হলের দিকে ফিরে এলাম। তখন কুয়াশা বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। সোহরাওয়ার্দী হলে এসে খোঁজ নিতে শুরু করলাম, আমাদের সবাই ঠিক আছে কিনা? কে কে আহত হয়েছে। বদরুল ভাইকে আগেই দেখেছি তার বুকে ৪৫টার মতো ছররাগুলি লেগেছে। চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। হল গেটে মুস্তাফিজ ছাড়া সবাইকে পেলাম। তার কথা কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ কিছুই বলতে পারলো না। একজন বলল, একবার শুধু ডাইনিং-এর ছাদে দেখেছি। চিন-া করলাম সে তার রুমে বা অন্য কোথাও থাকতে পারে। এর মধ্যে হলের একজন গার্ড এসে সংবাদ দিল, ডাইনিং-এর ছাদে একজন পড়ে আছে। ৫/৬ জনকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ডাইনিং-এর ছাদে গেলাম। দুর থেকে দেখি একজন উপুড় হয়ে নিশ্চিত মনে ঘুমাচ্ছে। এ রকম গভীর আবেশে তো তারাই ঘুমাতে পারে যাদের দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, না পাওয়ার ব্যথা নেই, যারা পেয়েছে বিরাট সাফল্যের বড় পুরস্কার, ভি.আই.পি. মর্যাদার সনদ। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের আর কিছু নেই। দুর থেকে দেখেও চিনতে কষ্ট হয়নি সে মুস্তাফিজ। কাছে গিয়ে তাকে ধরে সোজা করলাম। তখনও তার শরীর গরম। মুখে লেগে আছে মহা সাফল্যের হাসি। তার এ বড় পুরস্কার প্রাপ্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের দু'চোখের অশ্রু বন্যায় বাঁধ দিতে পারিনি।
আমরা ক’জন মিলে মুস্তাফিজকে হল গেটে এনে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস'া করলাম। হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার জানিয়ে দিল মুস্তাফিজ সবাইকে ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছ্‌ে যে মুস্তাফিজ ইসলামী আন্দোলনের জন্য সারারাত জেগে হল গেট পাহারা দিয়ে ফজরের নামায পড়ে ঘুমিয়েছিল, আর তোমরা বোমা আর গুলির শব্দে তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করলে! সে এখন চির সুখের নিদ্রায় শায়িত। সে শানি-র নিদ্রার ধারে কাছে যাওয়ার সাধ্য তোমাদের কারো নেই। মুস্তাফিজের শাহাদাতের খবর শুনে খুব কেঁদিছিলাম। আমার জীবনে আর কখনও এতো বেশি কাঁদিনি।
বেশ কয়েকবার শহীদ মুস্তাফিজের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলম ডাঙ্গা থানা শহরেই বাড়ি। সাত ভাইয়ের মধ্যে মুস্তাফিজ ছিল চতুর্থ। মা মারা গেছেন তাদের ছোট বেলাতেই। প্রথম যেবার আলমডাঙ্গা গিয়েছিলাম। বাড়ির সবার কান্না কাটি দেখে নিজের আবেগ উচ্ছ্বাসকে দমিয়ে রাখতে পারিনি। বাড়ি থেকে একটু দুরেই গোরস'ান। সবাই মিলে গেলাম কবর জিয়ারত করতে। দূরে থেকেই দেখলাম সাইনবোর্ড লেখা আছে শহীদ মুস্তাফিজুর রহমান। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আমার প্রিয় অগ্রপথিক, মুস্তাফিজ। মহান আল্লাহর কাছে আবেদন জানালাম হে রাব্বুল আলামীন! মুস্তাফিজের সাথে দীর্ঘদিন এক বিছানায় ঘুমিয়েছি, এক সাথে খেয়েছি, তোমার সেই প্রিয় বান্দার সুখনিদ্রার বিছানার এককোণে এতটুকু জায়গা এ পাপী বান্দার জন্য হবে কি?
(লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)


অনুভবে অলিন্দ অনুভবে মুস্তাফিজ

আলমগীর হাসান রাজু

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে যার নামটি হৃদয়ের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলো তিনি হলেন শহীদ মুস্তাফিজুর রহমান। শহীদের রুমমেট ও বেডমেট হবার কারণে তাকে কাছে থেকে দেখার যে সুযোগ আমি পেয়েছি বোধ করি এমন সুযোগ আর কেউ পায়নি। মানব জীবনের একটা স্বাভাবিক আশা সবার মধ্যে লুকায়িত থাকে। কেউ হয়তো বা জনসেবা করার আশা করে, কেউ দেশ সেবায় আত্মনিয়োগের প্রত্যাশায় থাকে। কেউ কেউ বাড়ি গাড়ি, এসিতে আরামের আকাঙ্খা নিয়ে নিজ কার্য সিদ্ধির প্রচেষ্টা চালায়। কিন' শহীদ মুস্তাফিজের সর্বোচ্চ আশা ছিল শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করা।
তিনি যেদিন ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসলেন সেদিনই আমি এ প্রাণ চাঞ্চল্যকর সাড়া জাগানো হাস্যোজ্জ্বল চেহারার ছাত্রটিকে দেখেই বুঝলাম যে তিনি একটি “ফুটন- গোলাপ”। তিনিই বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবেন। আল্ল্লাহ শেষ পর্যন- সেই সাজানো বাগানে সেরা ফুলটিকে কাছে টেনে নিলেন। হাজার হাজার সংগী সাথীদের করুণ আর্তিও আল্লাহ কবুল করলেন না। সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন পরপারে। শহীদ মুস্তাফিজ সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্র ছিলেন। ভর্তি পরীক্ষার পর থেকে আমার সংগে সখ্যতা গড়ে ওঠার কারণে শের-ই-বাংলা হলেই অবস'ান করতেন। পশ্চিম ৬ নং কক্ষেই আমরা সবাই থাকতাম। আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের জন্য ছিল বড় সংকটময় একটি মুহূর্ত। সে সময়ে শিবির বিরোধী জোট সংঘবদ্ধভাবে শিবির উৎখাতের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। আর তারা সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকত।
নেকড়ের মত নিরীহ ছাগলপালের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও রক্ত পান করতে তারা এতটুকুও দ্বিধাবোধ করত না। কঠিন এ সময়ে শিবিরের প্রতি জনশক্তিকে দিনের ২৪ ঘন্টায় প্রস'ত থাকতে হতো আত্মরক্ষার্থে। সারাদিন সারারাত প্যান্ট খোলার পরিবেশ পাইনি। রাত্রে ঘুমাতে পারেনি শিবির কর্মীরা। ক্লাস করার সুযোগ থেকে আমাদের করা হয়েছে বঞ্চিত। বিরোধীদের নিকট থেকে জীবন বাঁচানোর স্বার্থেই আমাদের টেন্টে বসে থাকতে হতো। এ ক্ষেত্রে শহীদ মুস্তাফিজের ভূমিকা ছিল অগ্রপথিকের।
১৯৯২-’৯৩ সেশনে ভর্তি হবার পর শহীদ মুস্তাফিজ আমার নিকটেই থাকতেন। সংগঠনের সকল নির্দেশ হাসিমুখে বরণ করে নিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে তার দ্বিধাহীন আনুগত্যের নজীর খুব কমই আছে। যখন সময়ের প্রয়োজনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে কোন কাজের আহ্বান আসত শহীদ মুস্তাফিজ নিঃশঙ্ক চিত্তে সবার আগে গিয়ে সেখানে হাজির হতেন।
একদিনের ঘটনা আজও আমার মনে দোলা দেয়। হলে রাতের পাহারায় কয়েকজনকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। শহীদ মুস্তাফিজের ডিউটি রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন-। পরবর্তীতে আমার ডিউটি পালন করার কথা। সংগঠনের কাজে ব্যস-তার কারণে ক্লান- হয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। শীতের প্রচন্ডতায় কুকড়ে যাবার মত অবস'া। শহীদ মুস্তাফিজ আমাকে ডাকলেন না। তিনি একা একাই ডিউটি দিয়ে রাত পার করলেন। সকালের সূর্যের উকিতে আমার ঘুম ভাঙ্গলে শহীদ মুস্তাফিজকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন আমাকে ডাকলেন না? তিনি হাসি মুখে জবাব দিলেন-‘আমার এ অতিরিক্ত ডিউটি আমার আল্ল্লাহর খুশীর কারণ হতে পারে।’ আমি তার কথায় তাজ্জব হয়ে গেলাম, আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনার্থে আল্ল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম, “হে আল্ল্লাহ্‌ তোমার এ বান্দাকে পরিচালনা করার কোন যোগ্যতা আমার নেই। তুমি তাকে নেতৃত্বের আসনে আসার সুযোগ করে দাও।” সেদিন বুঝতে পারিনি যে আল্লাহ তাকে এভাবে শাহাদাতের উচ্চাসনে আসীন করবেন। তার এ মর্যাদায় বারবার আল্ল্লাহর নিকট মাথা নুয়ে আসে।
একদিন আমরা অতিথি কক্ষে বসে আলাপ করছিলাম। এমন সময় মুস্তাফিজ ভাই বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে দুনিয়ার সময় আমার ফুরিয়ে এসেছে-আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন।’ তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। অপ্রত্যাশিত এ কান্নার কারণ আমি বুঝতে পারলাম না। এ ঘটনার ২/৩ মাস পরই তিনি আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিলেন।
অথচ আমরা শের-ই-বাংলা হলে এক সঙ্গে থাকতাম। তখন ১ম বর্ষ ও ২য় বর্ষের একটি বেজ গড়ে উঠে। সবাই এক সঙ্গে ক্যাম্পাসে যাওয়া, একই সঙ্গে ডাইনিং-এ খাবার খাওয়া, একই সঙ্গে ঘুরাফিরা করতাম। সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলেও সামান্যতম মানসিক দুশ্চিন-া তার মাঝে দেখা যায়নি। যেন তিনি দুনিয়াকে জয়ের নেশায় বিভোর হয়ে আছেন বলে মনে হয়।
আমাদের দিনগুলো হাসি আর আনন্দের মাঝেই কেটে যাচ্ছিল। তখন বুঝতে পারিনি আমাদের জন্য কান্না অপেক্ষা করছে । শহীদ মুস্তাফিজকে সিদ্ধান- দেওয়া হলো নিজ হল সোহরাওয়ার্দীতে থাকার জন্য। মুস্তাফিজ ভাই শুধু বললেন, আপনাদের নিকট এতদিন থেকেছি এখন আমার হলে আপনাদের নিয়ে যাব। তিনি নিজ হলের আসল কক্ষেই গেলেন। কিন' দিয়ে গেলেন বেদনা ও যাতনা। তাঁর ওপারে যাত্রায় শিবিরের হাজার হাজার শোকার্ত নেতা কর্মীরা যেভাবে বুক ফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী করে তুলেছিল মনে হয় আর কারও হারানোর বেদনায় এমনটি হয় নি।
ইবাদত পালনে শহীদ মুস্তাফিজ ছিলো অত্যন- পরিচ্ছন্ন। সকালে তিনি ফজরের নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করতেন। কিছু সময় একমনে কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। ফজরের পূর্বে মাঝে মাঝে দেখা হত মসজিদের এক কোণে। নিবিষ্ট চিত্তে দাঁড়িয়ে আছেন মহান প্রভুর প্রেমের নেশায়। আশে পাশে কেউ থাকলেও তিনি টের পেতেন কিনা জানিনা, তবে ২/৩ দিন একই সঙ্গে নামাজ আদায়ের পরও তিনি আমার উপসি'তি টের পাননি।
আল্লাহর অতি নিকটের এ বান্দার খবর হলের সবাই জানতেন না। তিনি যখন তাহাজ্জুতের নামাজে দাঁড়াতেন, মনে হত কোন শালবৃক্ষ দাঁড়িয়ে আছেন। আল্ল্লাহর প্রেমিক শহীদ মুস্তাফিজের সাহচর্যে আর কিছুকাল থাকতে পারলে আমিও হয়তো তার মত আল্ল্লাহ প্রেমিক হবার সুযোগ নিতে পারতাম। কিন' মহান রব সে সুযোগ আমাকে দেননি।
শহীদ মুস্তাফিজ ব্যক্তি জীবনে তাড়াতাড়ি ছাত্রদের আপন করে নিতে পারতেন। হয়তো বাড়ি থেকে ক্লান- শ্রান- হয়ে এসেছেন। কিন' বিশ্রাম না নিয়েই তিনি ছাত্রদের রুমে রুমে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। ক্লাস করে এসেছেন-তাড়াতাড়ি ভিড়ের মধ্যে ডাইনিং-এ ঢুকতেন। জায়গা নেই বসার। প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাড়াহুড়ো করতেন না বসার জন্য। প্লেট নিয়ে অন্য ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি মুহুর্তে খাবার শেষ করে তাদের বসার সুযোগ করে দিতেন। হলে অবস'ান কালে তার সঙ্গে কারও কথা কাটাকাটি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সবাইকেই তিনি আন-রিকতার সাথে ভালবাসতেন। তাকেও সবাই যেন তারই একজন আপন স্বজনের মত মনে করতো।
শাহাদাতের পরে একদিন তাদের বাড়িতে যাবার সুযোগ হলো। শহীদের আপন মায়ের বিয়োগ অনেক পূর্বেই ঘটেছিল। তিনি সৎ মায়ের সংসারে আসে- আসে- বড় হয়ে ওঠেন। আলাপের এক পর্যায়ে শহীদের সৎ মাতা অশ্রু সজল নয়নে বললেন, “কোন দিন মুস্তাফিজের আচরণে সতীনের ছেলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে সে যেন আমারই পেটের সন-ান। তার সুমধুর ব্যবহারে সব সময় আমাকে শানি- দিয়েছে। কোন দিন আমার সঙ্গে কথাবার্তায় মন খারাপ করেনি। যখন যা বলেছি অকপটে কাজটি হাসি মুখে করে দিয়েছে।”
শহীদের মায়ের চোখ দিয়ে অবিরাম পানি ঝরছিলো। তিনি কথা বলছিলেন আর ফাঁকে ফাঁকে শাড়ির আঁচল দিয়ে ভেজা চোখ দুটো মুছে নিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, “বাবা, এই যে আমার পেটের সন-ান এদেরকে হারিয়ে যদি আমার মুস্তাফিজকে পেতাম তাহলেও আমার মনে শানি- পেতাম। মুস্তাফিজকে হারিয়ে আমি যেন চারিদিকে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। চারিদিকে শূন্যতা বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে দুনিয়ায় আমার বুঝি আপন বলতে আর কেউ নাই।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শহীদের মাতা বললেন-“মুস্তাফিজ যখন ভার্সিটি থেকে এসে আমাকে মা বলে ডাক দিতো তখন আমার অন-র আনন্দে ঠান্ডা হয়ে যেত। চোখ জুড়িয়ে যেত তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে।”
গল্পের এক পর্যায়ে শহীদ মাতা বললেন-“আমার মুস্তাফিজ মিষ্টি খেতে বেশি পছন্দ করত। তাই বাড়ি আসার পর আমি দ্রুত তার জন্য মিষ্টির ব্যবস'া করতাম। এজন্য মুস্তাফিজ আমাকে বেশি বেশি শ্রদ্ধাভরে ডাকত। আমার সামান্য আদরে সে ব্যাকুল হয়ে যেত। মুস্তাফিজ বাড়িতে আসার দিন কিছু না কিছু ছোট ভাই বোন ও আমার জন্য নিয়ে আসত। অনেক দিন তাকে নিষেধ করেছি। সে উত্তর দিয়েছে মা খালি হাতে আমার মায়ের নিকট আসতে ইচ্ছা করে না। মা তুমি রাগ করলে আর কিছু সঙ্গে করে আনব না। মুস্তাফিজের চেহারায় সামান্য চিন-ার রেখা ও মন খারাপ বুঝতে পেরে কোন দিন তাকে আর আমি জিনিসপত্র খাবার-দাবার আনতে নিষেধ করিনি।”
শহীদ মুস্তাফিজের বন্ধুদের সঙ্গেও কথা হলো। যারা তার স্কুল জীবনের সঙ্গী ছিল। স্কুল ও কলেজের বন্ধুরা শহীদ মুস্তাফিজের অকাল মৃত্যুতে নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে ২/৩ জন বন্ধু মুস্তাফিজকে হারিয়ে দীর্ঘদিন শোকে কারও সঙ্গে কথা বলত না। এক বন্ধু বলল, “কত দিন যে মুস্তাফিজকে রাগানোর জন্য মিছামিছি কষ্ট দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। একবারও এই ছেলেটিকে রাগতে দেখিনি। সব সময় হাসি মুখে সবার অন-র জয় করে নিয়েছে। কখনও আমাদের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়নি। সামান্য মন কষাকষির ঘটনা ঘটেনি। আমরা তার নিকট অপরাধী ছিলাম। আমাদেরকে আগে মৃত্যু বরণ করা উচিত ছিলো। সে সুযোগ আমরা পেলাম না। আমরা হারালাম আমাদের একান- নিকটের বন্ধু মুস্তাফিজকে।”
১২ ফেব্রুয়ারী ’৯৫ একটি ভয়াল রাত্রি। সেই লোমহর্ষক, অতি ভয়ংকর অবস'ার কথা লেখা সম্ভব নয়। এখনও প্রতি মুহুর্তে সে পৈশাচিকতার কথা মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। হৃদয়ে প্রতিশোধের স্পৃহা শিহরণ জাগায়। জানি না প্রতিক্ষণে প্রতিশোধের যে পীড়া আমাকে আঘাত করছে, কোন সময় হয়তো আমি পাগলের ন্যায় খোলা অসী হাতে বেরিয়ে মুস্তাফিজের খুনীদের খুঁজতে থাকব। সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে কোন তাজা মানুষই বসে থাকতে পারে না। পাথরের মত ধৈর্য্য ধরে বসে আছি। খুনীরা দাপটের সাথে উল্ল্লাস করছে পুলিশের চোখের সামনে। গ্রেফতার করা দূরে থাক সন্ত্রাসীদের আড়াল করে পাহারাদারের ভূমিকা নিয়েছে তারা।
১১ ফেব্রুয়ারীতে শিবিরের তৎকালীন শাখা সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দের মুক্তির মিছিলে আমরা মুস্তাফিজসহ উপসি'ত হলাম। মুস্তাফিজ ভাই সভাপতিকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে বললেন, “মতিউর ভাই, আমাকেও ফুলের মালা দিয়ে বরণ করবেন।” জানতাম না যে মাত্র ১২/১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি সেই অমূল্য সর্বোচ্চ ফুলের মালাটি দখল করবেন।
ফুল ছিল শহীদ মুস্তাফিজের সবচেয়ে শখের বস'। তিনি ফুলের বাগান করতেন। তার এই নেশা হলে থেকেও দেখেছি। শহীদ মিনারের পাদদেশে ফুলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সময় কাটাতেন। স্মৃতি সংগ্রহশালায় বসে বসে ফুলের সুবাস নিতেন। সময় পেলেই শের-ই-বাংলার গেটের সামনের বাগানটিতে একা একা বসে থেকে গভীর চিন-ায় মনোনিবেশ করতেন। পিছনে গিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলেও ডাক না দেয়া বা শরীরে ঝাঁকুনি না দিলে কারও উপসি'তি টের পেতেন না। শহীদ মুস্তাফিজের ব্যক্তি জীবনের স্মৃতিগুলো অম্লান হয়ে আছে। ছাত্রশিবিরের উদীয়মান সাফল্যকে সরকারী পেটুয়াবাহিনী ছাত্রদল সহ্য করতে পারল না। তারা শিবিরের অগ্রযাত্রাকে নিঃস-ব্ধ করে দিতে চাইল। তারা হত্যার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। নীলনক্সাও সুনিপুনভাবে তৈরি করল। হায়েনারা বুঝতে দেয়নি তাদের এ নরখাদক রক্ত পিপাসার কথা। জীবনের প্রদীপ নিভানোর নৃশংসতার ইতিহাস তাদের জন্মলগ্ন থেকে আরম্ভ হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী হলে সাধারণ ছাত্রদের সিট হয়েছে। ছাত্রদলের ক্যাডাররা ঐ সকল ছাত্রদের সিটে উঠতে দিলো না। তাদের তাড়িয়ে দিল হল থেকে। তারা শিবিরের পায়ে পাড়া দিয়ে গন্ডগোল করার ষড়যন্ত্র করলো। শিবির মহানগরীর মিছিল শেষে হলে ফিরে আসলে ষড়যন্ত্র বুঝতে পারল। হলের শিবির কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদের জানাল, সেক্ষেত্রে নেতারা ধৈর্য্য ধারণের নছিহত করলেন। ছাত্রদলের উস্কানিমূলক কথাবার্তা ও প্রাণনাশের হুমকিতে শিবির কর্মীদের উত্তেজনা দেখা দিলেও সংগঠনের স্বার্থে তারা ছিলো শান-। হঠাৎ করে হবিবুর রহমান হলে ছাত্রদল শিবিরের ওপর আক্রমণ করলো। আমাদের কর্মীরা তাদের প্রতিহত করলো সাধারণ ছাত্রদের সাথে নিয়ে। রাত ১১টার দিকে ছাত্রদল ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হলো। শিবির শানি-পূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য হলে হলে স্বাভাবিক অবস'ানে ফিরে এল। নরখাদকদের কিন' খুনের নেশা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তারা পুলিশের সহযোগিতায় খুনের নেশায় মেতে উঠলো। কাজলা গেট দিয়ে মাইক্রোবাস যোগে এক গাড়ি অস্ত্র রাত ১টার দিকে মাদার বখ্‌শ হলে প্রবেশ করলো। শিবির ছিলো শানি-র অন্বেষায় আর পুলিশ ও ছাত্রদল ছিল রক্তপাত ঘটাতে ব্যস-। সবেমাত্র হলের শিবির কর্মীরা রোজার জন্য সেহরী খেয়ে ফজর নামাজ শেষে বিছানায় ক্ষণিকের জন্য গা এলিয়ে দিয়েছে। ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা মোকাম্মেলের নেতৃত্বে এ সময়ে সোহরাওয়ার্দী হলের গেটে বুলেট ছুঁড়ে তালা ভেঙ্গে ফেলল। এক সঙ্গে ৩০/৩৫ জন সন্ত্রাসী হলে ঢুকে শিবির কর্মীদের হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো। ফাটাতে লাগলো শক্তিশালী বোমা। ভয়ে কেঁপে উঠল হলের সকল ছাত্র। দিক বিদিক ছুটাছুটিতে অনেকে গুলিতে গুরুতর আহত হলো। কেউ কেউ পালিয়ে প্রাণ বাঁচল।কেউ বা চকিতে বেডের তলায় আশ্রয় পেল। কেউ টয়লেটের মাঝে কিয়ামতের দৃশ্যকে দেখতে থাকল। আর সন্ত্রাসীরা শিবির কর্মীদের নাম ধরে গালিগালাজ করতে লাগল। স্টেনগান ও বন্দুক হাতে উল্লাস করতে করতে গুলি ছুড়ল।
শহীদ মুস্তাফিজ ইচ্ছা করলে পালাতে পারতেন। কিন' তিনি কাপুরুষের পরিচয় দিলেন না। তিনি তার কক্ষের সামনে প্রতিরোধ গড়লেন। ক্ষণিক পরে আর টিকতে পারলেন না। পিছু হটে পূর্ব ব্লকের ডাইনিং এর ছাদে আর একবার চেষ্টা করলেন প্রতিরোধের। শেষ রক্ষা হলো না। স্টেনগানের গুলিতে তার বুক ঝাঝরা হয়ে গেল। তিনি ডাইনিং এর ছাদে লুটিয়ে পড়লেন। ব্যাপক রক্তক্ষরণে তিনি শক্তি হারালেন। উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। এভাবে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন। ডাক্তার পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে লিখলেন ৬৩টি বুলেট তার বুক থেকে বের করা হয়েছে। শহীদ মুস্তাফিজ বীরের ন্যায় আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিলেন। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে আবার পালালো। কিন' আমাদের মাঝ থেকে তারা ছিনিয়ে নিল মুস্তাফিজ ভাইকে। দিয়ে গেল খুনীরা আমাদের ভাই হারা শোক ও বেদনা। খুনীরা গ্রেফতার হয়নি ঠিকই কিন' আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে এক মুহুর্তের জন্যও ঠাঁই হয়নি। তাদের কেউ আমার সামনে পড়লে কিছু না বললেও ভয়ে তাদের মুখ পাংশু বর্ণ ধারণ করে। আমরা শহীদ মুস্তাফিজের রক্তের বদলা হত্যাকান্ডের মাধ্যমে চাই না। আমরা মুস্তাফিজের রক্তের বদলায় মানব রচিত আদর্শের অপমৃত্যু চাই। যে ইসলামের স্বার্থে তিনি জীবন দিলেন আমরা সেই ইসলামের বিজয় চাই। ইসলামের বিজয়ের মাধ্যমেই আমরা তার খুনের প্রতিশোধ গ্রহণ করবো। আল্ল্লাহর নিকট কামনা করব মহান আল্ল্লাহ যেন আমাকে কিয়ামতের কঠিন সময়ে শহীদ মুস্তাফিজের সাক্ষাৎ লাভ করার সুযোগ দেন। দুনিয়ার ন্যায় আবার একই সঙ্গে থাকতে পারি। এটাই একান- প্রত্যাশা।
আর মনে পড়ে আল্ল্লাহর সেই ঘোষণা-“যারা আল্ল্লাহর পথে জীবন দান করে তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না-বরং তারা জীবিত কিন' তোমরা তা বুঝতে পার না।” আমীন।
(লেখক: সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

কোন মন্তব্য নেই: